তারপর

ইংরেজ ভারত ছাড়ো আজই ডাক দেওয়া হয়েছিল

By Master

August 09, 2020

আসামের ধুলিয়াজুলি পুলিশ স্টেশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে প্রায় শদুয়েক মানুষ। অনেকের হাতেই তেরঙা পতাকা। তারিখ ১৯৪২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। মিছিলের সামনের সারিতে আছে বার বছরের একটি মেয়ে, তিলেশ্বরী বড়ুয়া । ইতিমধ্যেই নাম লিখিয়ে নিয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলনের সুইসাইড স্কোয়াডে যার নাম মৃত্যু বাহিনী । মিছিল পুলিশ স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই ব্রিটিশ পুলিশের রাইফেল থেকে বেরিয়ে এলো গুলি ।অনেকের সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সেই মেয়েটিও। থেমে থাকে নি জনতার আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা । পুলিশ স্টেশনে টাঙিয়ে দেওয়া হল তেরঙা পতাকা ।

আসামের গহপুর মহকুমাতেও ওই একই দিনে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে জনতা এগিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের দিকে। উদ্দেশ্য পুলিশ স্টেশন থেকে ব্রিটিশ পতাকা খুলে সেখানে টাঙিয়ে দেওয়া হবে তেরঙ্গা পতাকা । সেই মিছিলের সামনের সারিতে হাঁটছে আরেকটি মেয়ে । সতের বছরের কনক লতা বড়ুয়া । পুলিশ স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই গুলি চালালো পুলিশ। মাটিতে লুটিয়ে পড়লো মেয়েটি । আটকে রাখা যায় নি আন্দোলনকারীদের । পুলিশ স্টেশনের ছাদে উড়ছে তেরঙ্গা পতাকা ।পুলিশ স্টেশনকে ঘিরে রেখেছে আন্দোলনকারীরা।

পরের ঘটনা। ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪২। স্থান মেদিনীপুরের তমলুক । প্রায় ৭০০ জনতা , যাদের অধিকাংশই মহিলা , এগিয়ে যাচ্ছেন তমলুক পুলিশ স্টেশনের দিকে । মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বাহাত্তর বছরের এক মহিলা । মাতঙ্গিনী হাজরা । একই ঘটনা ঘটল এখানেও । । মাতঙ্গিনী হাজরা কে লক্ষ্য করে গুলি চালালো পুলিশ। থেমে থাকেননি তিনি — এগিয়ে গেলেন । আবার বুকে গুলি লাগলো। পেছনের সাথীদের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো চিৎকার করে বললেন ‘ব–ন্দে–মাতরম’ । তৃতীয় গুলিও লাগল বুকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন মাতঙ্গিনী হাজরা ।

বতন ক্যা রাহ মে বতন কে নওজোয়ান শহীদ হো — শহীদ সিনেমায় মহম্মদ রফি এই গান গাইতেনও না যদি না আজকের দিনেই আটাত্তর বছর আগে , তিয়াত্তর বছরের এক বৃদ্ধ ডাক দিতেন , ‘ইংরেজ তোমাকে ভারত ছাড়তে হবে’ । আজ ৮ আগস্ট । ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের তীব্রতা অসম্ভব শক্তিতে প্রকাশিত হবার দিন।

বোম্বের গোয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দান থেকে এক বৃদ্ধ আটাত্তর বছর আগে যে ডাক দিয়েছিলেন , প্রায় সারা দেশই গান্ধীজির ডাকে সামিল হয়েছিল । যদিও সাথে ছিল না আর এস এস , হিন্দু মহাসভা , কম্যুনিস্ট পার্টি এবং ইন্ডিয়ান মুসলিম লীগ । ভারত ছাড়ো আন্দোলন এতে গতিহারা হয়ে যায় নি । এটা তো ঘটনা আজ পর্যন্ত কংগ্রেস পরিচালিত আন্দোলন গুলোর মধ্যে এই আগস্ট আন্দোলনই সবথেকে বেশি ব্যপকতাময় এবং জঙ্গী । গান্ধীজির এক ডাকেই সারা দেশ জুড়ে বিক্ষিপ্ত ভাবে আন্দোলনের যে বুদবুদ উঠতে শুরু করেছিল , মাস খানেকের মধ্যেই পুরো মানচিত্রই হয়ে উঠেছিল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততার ক্যানভাস ।

কেন ছিল এতটা গণভিত্তি ? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন শুরু হয়ে গিয়েছে । ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধের সিংহভাগ ব্যয়ভার চাপিয়ে দিয়েছিল জনগণের ওপর। কৃষক , গরীব অংশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহনে পুষ্ট হয়েছে এই আন্দোলন । ব্রিটিশ পুলিশের এক রিপোর্টে বাংলায় কৃষকদের অংশগ্রহণকে উল্লেখ করে বলাই হয়েছে ,” The stirring up of the pessentry is the most disturbing feature of the movement at the present time ….” । কংগ্রেস বাদে অন্য রাজনৈতিক দল গুলোর মুখ ফিরিয়ে থাকা তো আছেই , একইসাথে ‘দিশাহীন’ তকমাও জুটেছিল এই আন্দোলনের গায়ে ।

তিলেশ্বরী , কনকলতা , মাতঙ্গিনী হাজরা দের কথা না জেনেও আমরা শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারি — স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপটের যৌক্তিক বিশ্লেষণ না করেও পলিটিক্যালি লিটারেট কিংবা ফ্যাশনদুরস্ত দেশপ্রেমীও হয়ে ওঠা যায় ।